
স্টাফ রিপোর্টার :
রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই—এই বহুল উচ্চারিত কথাটি নরসিংদীর মাটিতে যেন আবারও নির্মমভাবে সত্য প্রমাণিত হলো। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, দেশের রাজনীতির এক কঠিন অধ্যায় ছিল ২০০৭ সালের সেই আলোচিত সময়, যা পরিচিত ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে। সেই অস্থির সময়ে যখন অনেকেই নীরব ছিলেন, কেউ কেউ সুবিধার পথে হাঁটলেন, তখন কিছু নেতা দাঁড়িয়েছিলেন কেবল দল আর আদর্শের পক্ষে। আজ সুসময়ের প্রভাতে দাঁড়িয়ে তারাই যেন সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। ২০০৮ সালের বিতর্কিত সেই নির্বাচনে বিএনপি আসন পায় মাত্র ৩০টি। কিন্তু ওই সময় নরসিংদীর তিনজন বিশ্বস্ত নেতা দলের পক্ষে অবস্থান নেন।
বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া যখন সংস্কারপন্থী রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে, তখন দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনে প্রার্থী হন। তার বিপরীতে দাঁড়ানো মানেই ছিল ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা, এমনকি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিসর্জনের আশঙ্কা। সেই সময় ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সাহস করে মাঠে নামেন তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার। তিনি জানতেন, জয় হয়তো আসবে না; তবু দলকে ‘বেইমানির’ অভিযোগ থেকে রক্ষা করতে হবে—এই ছিল তার একমাত্র সংকল্প। ১৫ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল বিশ্বস্ততার স্বীকৃতি—যা আজ ইতিহাসের আড়ালে হারিয়ে গেছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে যখন আওয়ামী লীগ মাঠে নেই, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন এবার হয়তো পুরস্কৃত হবেন সেই পরীক্ষিত নেতা। কিন্তু মনোনয়ন গেল মনজুর এলাহীর হাতে—যিনি একসময় জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হন। আর তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার? তিনি রয়ে গেলেন পাশে, সহ-সভাপতির পদে একরকম ডিমোশনের আঘাত বুকে নিয়ে। তার অনুসারীরা বলেন, “দলের জন্য দাঁড়ানোই কি ছিল তার অপরাধ?”
একই চিত্র নরসিংদী-৪ (বেলাবো-মনোহরদী) আসনেও। সংস্কারপন্থী নেতা সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন (বকুল) যখন বিতর্কে, তখন রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো:জয়নুল আবেদীন ধানের শীষ হাতে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ৭৮ হাজার ৭৮৯ ভোট পেয়ে তিনি প্রমাণ করেন, মানুষের আস্থা আদর্শের ওপরও থাকে। কিন্তু আজ সুসময়ে মনোনয়ন ফিরে গেছে সেই সরদার সাখাওয়াত হোসেনের কাছেই—যিনি এখন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে। বিশ্বাসঘাতকতা করেও হলেন পুরস্কৃত। আর জয়নুল আবেদীন? তাকে কেন্দ্রীয় কমিটির মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক করে একপ্রকার আড়ালে সরিয়ে রাখা হয়েছে। তার নীরবতা আজ অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনের চিত্রও ভিন্ন নয়। ২০০৮ সালে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা রাজউদ্দিন আহমেদ রাজু-র বিপরীতে দাঁড়ান জামাল আহমেদ চৌধুরী। ৭৭ হাজারের বেশি ভোট পান তিনি। সেই কঠিন সময়ে দলকে বাঁচাতে লড়াই করেছিলেন। কিন্তু এবার মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হওয়ায় তাকে বহিষ্কার হতে হয়েছে দল থেকে। বিশ্বস্ততার পুরস্কার যেন শাস্তিতেই রূপ নিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুঃসময়ে যারা দলকে আগলে রেখেছিলেন, সুসময়ে তারাই হয়ে গেলেন বলির পাঁঠা। তাদের ত্যাগ, তাদের সাহস—সবকিছু যেন নির্বাচনী অঙ্কের কাছে হার মেনে গেল। অথচ নরসিংদীর পাঁচটি আসনেই বিএনপি এবার বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। অনেকে বিশ্বাস করেন, এই তিন নেতাও মনোনয়ন পেলে জয় ছিনিয়ে আনতে পারতেন—কারণ মানুষের হৃদয়ে তারা এখনো জায়গা করে আছেন।
মনোনয়ন দেওয়ার সময় দলীয় চেয়ারপারসন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া যদি সুস্থ থাকতেন, তাহলে হয়তো সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতে পারত—এমন আক্ষেপ শোনা যায় তৃণমূলের কর্মীদের কণ্ঠে। তাদের চোখে আজও ভাসে সেই দিনগুলোর স্মৃতি, যখন প্রতিকূল সময়ে এই নেতারা ছিলেন সাহসের প্রতীক।
রাজনীতি হয়তো হিসাব-নিকাশ বোঝে, কিন্তু মানুষের হৃদয় বোঝে স্মৃতি আর বিশ্বস্ততা। নরসিংদীর মাটিতে আজও ফিসফিস করে উচ্চারিত হয় তিনটি নাম—তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার, জয়নুল আবেদীন, জামাল আহমেদ চৌধুরী। তারা হয়তো ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই, কিন্তু ইতিহাসের কঠিন অধ্যায়ে তাদের অবস্থান অমলিন।
সুসময় সবার জন্য সমান হয় না—নরসিংদীর রাজনীতির এই অধ্যায় হয়তো সেই নির্মম সত্যেরই আরেকটি দৃষ্টান্ত।
Leave a Reply