রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ১১:১৩ পূর্বাহ্ন

রাজনৈতিক ছলচাতুরি: নরসিংদীতে ত্যাগের রাজনীতিতে উপেক্ষিত মোকাররম পরিবারের আর্তনাদ!

প্রতিনিধি:
প্রকাশকাল : রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি :

নরসিংদীর রাজনীতিতে মোকাররম হোসেন ভূঁইয়া ছিলেন এক পরিচিত ও সংগ্রামী নাম। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থেকে তিনি নরসিংদী জেলা বিএনপির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং নরসিংদী জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সঙ্গে। দলীয় দুঃসময়ে রাজপথে থেকে আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কারণে বহুবার হয়রানি ও নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন তিনি। তবুও থেমে যাননি; পরিবার ও রাজনৈতিক আদর্শ—দুইয়ের ভার কাঁধে নিয়ে আজীবন লড়াই করে গেছেন।
সম্প্রতি তার মৃত্যুতে নরসিংদী জেলা বিএনপি ও জেলা যুবদল পৃথকভাবে দোয়া ও স্মরণসভা আয়োজন করেছে। সেখানে নেতৃবৃন্দ তার রাজনৈতিক অবদান, ত্যাগ ও সংগ্রামী জীবনের কথা স্মরণ করেছেন আবেগঘন ভাষায়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—শুধু স্মৃতিচারণ করলেই কি একজন ত্যাগী নেতার প্রতি প্রকৃত সম্মান দেখানো হয়?
মোকাররম হোসেন ভূঁইয়া শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন চার সন্তানের জনক। কঠিন সময়ে পরিবারকে আগলে রেখেও দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকেছেন। তার বড় ছেলে জুবায়ের হোসেন লাদেনও দীর্ঘদিন ধরে নরসিংদী জেলা ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি আশা করেছিলেন জেলা ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তাকে মূল্যায়ন করা হবে।
কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো—যখন মোকাররম ভূঁইয়া হাসপাতালে আইসিইউর বেডে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন, ঠিক তখনই ঘোষিত হয় প্রায় ৩৭৫  সদস্য বিশিষ্ট নরসিংদী জেলা ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। আর সেই কমিটিতে জায়গা হয়নি তার ছেলে জুবায়ের হোসেন লাদেনের।
এমন এক সময়ে, যখন একজন সন্তান বাবাকে বাঁচানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করছে, তখন রাজনৈতিক মূল্যায়নের প্রশ্নে তাকে উপেক্ষা করা শুধু দুঃখজনকই নয়, বরং মানবিক বিবেচনাতেও প্রশ্নবিদ্ধ। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিক তালিকায় লাদেনের নাম থাকলেও একটি স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনায় শেষ মুহূর্তে সেই নাম বাদ পড়ে যায়। যদি তা সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ছলচাতুরির জঘন্য উদাহরণ।
আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এই পরিবার শুধু রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকারই নয়; তাদের রয়েছে আত্মত্যাগের ইতিহাসও। মোকাররম ভূঁইয়ার বোনের ছেলে ডাক্তার সজীব স্বৈরাচারবিরোধী জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। অর্থাৎ পরিবারটি শুধু রাজনীতি করেনি, প্রয়োজনে জীবনও দিয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—এমন একটি পরিবারের সন্তান কি জেলা ছাত্রদলের একটি বিশাল কমিটিতে স্থান পাওয়ার যোগ্য ছিল না? একজন ত্যাগী নেতার উত্তরসূরিকে মূল্যায়ন করলে কি দলের এত বড় ক্ষতি হয়ে যেত? নাকি একটি কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে পরিবারটিকে দল থেকে বিচ্ছিন্ন করার নীলনকশা বাস্তবায়নে নেমেছে?
রাজনীতিতে মতভেদ থাকতে পারে, প্রতিযোগিতা থাকতে পারে; কিন্তু ত্যাগ ও অবদানের প্রতি ন্যূনতম সম্মানবোধ না থাকলে সংগঠনের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ রাজনীতি শুধু পদ-পদবির খেলা নয়—এটি আদর্শ, আত্মত্যাগ ও মানবিক মূল্যবোধেরও প্রশ্ন।
মোকাররম হোসেন ভূঁইয়ার শূন্যতা হয়তো পূরণ হওয়ার নয়। তবে তার পরিবারকে সম্মান ও মূল্যায়নের মাধ্যমে অন্তত দল প্রমাণ করতে পারে যে ত্যাগ কখনও বৃথা যায় না। অন্যথায়, রাজনৈতিক ছলচাতুরি আর অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের কাছে একের পর এক ত্যাগী পরিবার হারিয়ে যাবে, আর রাজনীতি হয়ে উঠবে কেবল সুবিধাবাদীদের অভয়ারণ্য।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category