সম্পাদকীয়:

ভোর হলেই একদল লোক সিএনজি নিয়ে নরসিংদী শহর থেকে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ছুটে যায়। তারা বিভিন্ন সরকারি অফিস, ইটভাটা, বেকারি, ভাঙারির দোকান, আইসক্রিম কারখানাসহ নানা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে অর্থ দাবি করে। তাদের চাহিদাও খুব বেশি নয়—২০০ থেকে ১,০০০ টাকা।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এদের অনেকেরই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। অথচ তাদের হাতে থাকে কথিত জাতীয় পত্রিকার পরিচয়পত্র। এসব পত্রিকার অনেকগুলোই কেবল কার্ড বিতরণ আর অর্থ আদায়ের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাংবাদিকতার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন ও কার্যকর নীতিমালা না থাকায় আজ যেন যে কেউ নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিতে পারে।
এই ধরনের নিম্নমানের চাঁদাবাজির কারণে প্রকৃত সাংবাদিক এবং সাংবাদিকতার মতো একটি মহৎ পেশা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। যারা এদের টাকা দেয়, তারা অনেক সময় প্রকৃত, শিক্ষিত ও পেশাদার সাংবাদিকদেরও একই চোখে দেখে। তাদের ধারণা হয়ে গেছে—সাংবাদিক মানেই ২০০ থেকে ১,০০০ টাকা চাঁদা। এমনকি কেউ কেউ গর্ব করে বলেন, “সাংবাদিক আমার পকেটে থাকে।”
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান অর্থের বিনিময়ে শিক্ষাগত যোগ্যতা বা পেশাগত দক্ষতা বিবেচনা না করেই পরিচয়পত্র দিয়ে থাকে। তাদের কাছে যোগ্যতার চেয়ে অর্থই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আবার এমনও কিছু ব্যক্তি আছেন, কোনো সাংবাদিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করলে তারা অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নিজেকে বড় সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বলেন, “যিনি রিপোর্ট করেছেন তিনি আমার ছোট ভাই। কিছু টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করুন, আমি রিপোর্টটি সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।”
আমি ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের অসংখ্য ফোন পেয়েছি। কোনো প্রতিবেদন সরিয়ে দেওয়ার জন্য ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রস্তাবও এসেছে। অথচ যারা এসব করেন, তাদের অনেকেরই জীবনে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবাদ প্রতিবেদন লেখার সক্ষমতা নেই। তবুও তারা সাংবাদিক পরিচয় বহন করেন।
আবার কেউ কেউ দুই-একটি লাইন লিখে ফেসবুকে পোস্ট করেন—”অনুসন্ধান চলছে, বিস্তারিত পরে আসছে।” এরপর আর কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ হয় না। বরং ওই পোস্টকে হাতিয়ার বানিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে লোক পাঠিয়ে বা ফোন করিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। টাকা পেলে পোস্ট মুছে ফেলা হয়, এমনকি পরে সেই ব্যক্তির পক্ষেও লেখা প্রকাশ করা হয়।
ফলে সমাজে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে—”৫০০ টাকা দিলেই সাংবাদিক দিয়ে যা ইচ্ছা লেখানো যায়।” কিন্তু তারা জানেন না, প্রকৃত সাংবাদিকতা কত কঠিন, দায়িত্বশীল ও জটিল একটি পেশা।
আরও দুঃখের বিষয়, কেউ দালালি করেন, কেউ সিএনজি চালান, কেউ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত—তবুও তাদের পকেটে সাংবাদিকের কার্ড থাকে। তারা পেশাদার সাংবাদিকতা করেন না; প্রয়োজনে কেবল পরিচয়পত্র ব্যবহার করে নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেন।
তাহলে এরা কী ধরনের সাংবাদিক? আর এগুলোই বা কেমন সাংবাদিকতা?
সময় এসেছে সাংবাদিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন, নীতিমালা ও জবাবদিহিমূলক নিবন্ধন ব্যবস্থা প্রণয়নের। তবেই প্রকৃত সাংবাদিকতা মর্যাদা ফিরে পাবে এবং অসাধু ব্যক্তিদের কারণে পুরো পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হবে না।