নিজস্ব প্রতিবেদক :
যৌতুকের টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার দায়ে স্বামী নুর আলম ওরফে রুপাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও ১ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছে।

নরসিংদীর নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মুহম্মদ আলী আহসান (জেলা জজ) আজ বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত নুর আলম ওরফে রুপা নরসিংদীর পলাশ থানার ঘোড়াশাল পৌরসভার উত্তর মিয়াপাড়া এলাকার মৃত আবুল হোসেনের বাড়ির ভাড়াটিয়া। তার পিতার নাম আঃ রহিম মিয়া।

*মামলার বিবরণ*
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৬ বছর আগে ভিকটিম সুমি আক্তারকে ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক রেজিস্ট্রি কাবিনে বিয়ে করেন নুর আলম। বিয়ের পর তারা ঘোড়াশাল পৌরসভার উত্তর মিয়াপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তাদের ৪ বছরের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।

বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই নুর আলম স্ত্রী সুমি আক্তারের কাছে যৌতুকের টাকা দাবি করে আসছিলেন। যৌতুকের জন্য সুমিকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো। এক পর্যায়ে সুমির বাবা মোঃ ফজলু মিয়া মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখতে নুর আলমকে নগদ ২ লাখ টাকা দেন। এরপরও নুর আলম আবারও ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে না পারায় নির্যাতন আরও বাড়তে থাকে।

যৌতুকের চাপে অতিষ্ঠ হয়ে সুমি আক্তার প্রবাসে পাড়ি জমান। সেখানে থেকে তিনি সন্তান ও স্বামীর ভবিষ্যতের জন্য দেশে প্রচুর টাকা পাঠাতেন। অভিযোগ রয়েছে, নুর আলম সেই টাকা জমা না রেখে অপচয় করেন।

দুই মাস আগে সুমি আক্তার দেশে ফিরে আসেন। ফেরার পর নুর আলম তার কাছে একটি মোটরসাইকেল দাবি করেন। মোটরসাইকেল কিনে দিতে অপারগতা জানিয়ে টাকা-পয়সার হিসাব চাইলে সুমিকে এলোপাথারী মারধর করা হয়।

*হত্যাকাণ্ড ও মামলা*
গত ১৮/১১/২০২৩ তারিখ রাত ১০টা থেকে ১৯/১১/২০২৩ তারিখ সকাল ১১টার মধ্যে যেকোনো সময় নুর আলম ও অজ্ঞাতনামা ২/৩ জন মিলে পরিকল্পিতভাবে সুমি আক্তারের গলা চেপে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে লাশ ভাড়া বাসার মেঝেতে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।

পরদিন সকালে নুর আলম শ্বশুরবাড়িতে এসে ছেলেকে রেখে যাওয়ার কথা বলে এবং জানায় তার মোবাইল মেরামতে গেছে। মেয়ে বাসায় না আসায় সুমির বাবা জামাইকে নিয়ে ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখেন মেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে।

খবর পেয়ে ঘোড়াশাল পুলিশ ফাঁড়ি ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নরসিংদী সদর হাসপাতালে পাঠায়। এ ঘটনায় সুমির বাবা মোঃ ফজলু মিয়া বাদী হয়ে নুর আলম ও অজ্ঞাতনামা ২/৩ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন।

*আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রায়*
রায়ে আদালত বলেন, “স্ত্রীকে গলা টিপে হত্যা করা একটি নৃশংস, অমানবিক ও ঘৃণ্য অপরাধ। এটি শুধু একজন নারীর জীবন কেড়ে নেওয়া নয়, বরং পারিবারিক সম্পর্কের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতি ভয়াবহ আঘাত।”

আদালত আরও বলেন, “স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার উপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেই সম্পর্কের ভেতর থেকে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড সমাজে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। এই সাজা সমাজে একটি শক্ত বার্তা দেবে যে নারীর প্রতি সহিংসতা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।”

শেষে আদালত পেনাল কোডের ৩০২ ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আসামী নুর আলম ওরফে রুপাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও ১,০০,০০০/- টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে ১ বছর সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

আদালত আশা প্রকাশ করেন, এই রায় সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা কমাতে এবং মানুষকে আইন মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করবে।