নিজস্ব প্রতিবেদক:
নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাংগা ইউনিয়ন পরিষদে ভুয়া তথ্য ও ঠিকানা ব্যবহার করে জন্ম নিবন্ধন তৈরির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে প্রাপ্ত সরকারি নথি, ভূমি রেকর্ড এবং সরেজমিন তদন্তে এমন একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে, যা পুরো জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ডাংগা ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান সাবেরুল হাই ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বাদল মিয়া আত্মগোপনে চলে যান। এরপর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাখাওয়াত হোসেন ফকির এবং হিসাব সহকারী (কাম-কম্পিউটার অপারেটর) জহিরুল ইসলাম জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকেন।
সরকারি সার্ভারে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ মারুফ (পিতা: মো. মামুন মিয়া, মাতা: রাশিদা বেগম), মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম (পিতা: কবির হোসেন, মাতা: রোকেয়া বেগম) এবং মোহাম্মদ ইয়ামিন মিয়া (পিতা: মো. জাকির মিয়া, মাতা: লাভলী বেগম)-এর জন্ম নিবন্ধনে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ডাংগা ইউনিয়নের কেন্দুয়াবো গ্রামের ২ নম্বর ওয়ার্ড উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়ে ওই নাম-পরিচয়ের কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারাও তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে পারেননি। অথচ সরকারি সার্ভারে তাদের জন্ম নিবন্ধন সক্রিয় রয়েছে। অনুসন্ধানে আরও এমন একাধিক জন্ম নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া গেছে, যেগুলোর ঠিকানা ও পরিচয় বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না।
একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, অস্তিত্বহীন এসব লোকেরা আসলে রোহিঙ্গা। এই রোহিঙ্গারা জন্ম নিবন্ধন দিয়ে পাসপোর্ট করে বর্তমানে বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে বলে দাবি সূত্রটির।
এছাড়া নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, কিছু জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার আগেই প্রশাসকের স্বাক্ষর দেওয়া হয়েছে। আরও জানা যায়, বর্তমান প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাখাওয়াত হোসেন ফকির পূর্ববর্তী সচিব মানিক মিয়ার নামে খোলা ইউজার আইডি ব্যবহার করে অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের কাজ পরিচালনা করলেও কাগজপত্রে নিজের স্বাক্ষর করেছেন। বিষয়টি সরকারি ডিজিটাল নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক বিধি লঙ্ঘনের প্রশ্নও সামনে এনেছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ভূমি রেকর্ডে দেখা যায়, নরসিংদী সদর উপজেলার চিনিসপুর ইউনিয়নের নন্দীপাড়া মৌজায় নামজারি খতিয়ান নম্বর ৪৮৮৮ এবং আরএস দাগ নম্বর ১৮৯৮-এর আওতায় ৪ শতাংশ জমি ক্রয় করা হয়েছে। ওই জমিতে নির্মিত হয়েছে একটি বহুতল ভবন। জমিটি সাখাওয়াত হোসেন ফকিরের নামে থাকলেও তার দাবি আরো পার্টনার আছে। কে আছে পার্টনার সেটি তিনি স্বীকার করেননি। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য ও বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী জমির মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা এবং ভবনের মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সম্পদের আনুমানিক মূল্য সাড়ে চার কোটি টাকা।
এ বিষয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাখাওয়াত হোসেন ফকিরের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি বলেন, “সব ডকুমেন্টস আছে, সাক্ষাতে এলে দেখতে পারবেন।” তবে পরবর্তীতে একাধিকবার সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ এবং ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।
হিসাব সহকারী (কাম-কম্পিউটার অপারেটর) জহিরুল ইসলাম বলেন, “আমি সাক্ষাতে কথা বলতে চাই।” এরপর আর কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে পলাশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এদিকে, একই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখনও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। এতে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—এতসব নথি, সরেজমিনে পাওয়া অসঙ্গতি এবং প্রকাশিত সংবাদের পরও কেন কার্যকর তদন্ত কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পুরো ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন, অর্থের লেনদেন, সম্পদের উৎস এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হোক। পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।