
নরসিংদী প্রতিনিধি:
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের তীব্র প্রভাবে নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী টেক্সটাইল শিল্প এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। বিশেষ করে শিল্পনগরী মাধবদী ও চৌয়ালা টেক্সটাইল অঞ্চলে প্রতিদিন দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা শিল্পখাতকে কার্যত স্থবির করে ফেলেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাধবদী দেশের অন্যতম প্রধান টেক্সটাইল হাব হিসেবে পরিচিত। এখানে উৎপাদিত সুতা, কাপড় ও তৈরি পোশাক শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাই পূরণ করে না, বরং রপ্তানি খাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে এই অঞ্চলের উৎপাদন সক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
টেক্সটাইল শ্রমিক রুবেল মিয়া বলেন, “আগে প্রতিদিন কাজ থাকত, এখন অনেক সময় বসে থাকতে হয়। বেতন কমে গেছে। পরিবার চালানো খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা খুব চিন্তায় আছি।”
শ্রমিক রহিমা আক্তার জানান, “আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এই অবস্থা খুব ভয়াবহ। বাজারে সবকিছুর দাম বেশি, কিন্তু আয় কমে গেছে। কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না।”
অন্যদিকে, কারখানা মালিক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “আমরা শুধু বিদ্যুৎ সমস্যায়ই ভুগছি না, গ্যাস সংকটও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। অনেক সময় গ্যাসের চাপ এত কম থাকে যে উৎপাদন চালানোই সম্ভব হয় না। এই অবস্থায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।”
চৌয়ালা টেক্সটাইল শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক নান্নু আলী খান বলেন, “ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে আমরা মেশিন চালু রাখতে পারছি না। একটি মেশিন বন্ধ হয়ে গেলে পুনরায় চালু করতে সময় ও অতিরিক্ত খরচ লাগে। এতে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। অনেক কারখানা সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে পারছে না, ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “কিছু কারখানা বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু ডিজেলের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা কঠিন।”
এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে শ্রমিকদের জীবনে। নিয়মিত কাজ না থাকায় অনেক শ্রমিকই পূর্ণ বেতন পাচ্ছেন না। কেউ কেউ আংশিক বেতন পাচ্ছেন, আবার কোথাও কাজের অভাবে ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় চাপ, গ্যাসের ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধতার কারণে শিল্পখাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল খাত, যা দেশের রপ্তানি আয়ের বড় একটি অংশ জোগান দেয়, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সংকট জাতীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নরসিংদীর শিল্প উদ্যোক্তা ও শ্রমিক নেতারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, শিল্পখাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি বরাদ্দ দেওয়া এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী টেক্সটাইল শিল্প বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের রপ্তানি খাত, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।
Leave a Reply