নিজস্ব প্রতিবেদক:
মনোহরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ডা. মোঃ রাশেদুল হাসান মাহমুদের দীর্ঘ প্রায় ৭ বছরের রাজত্ব ও ১৩ বছরের উপস্থিতির নেপথ্যে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর নানা অনিয়ম ও সিন্ডিকেট রাজত্বের চিত্র। প্রথম পর্বে তার দীর্ঘ কর্মকাল ও বদলি নীতিমালার ব্যত্যয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এবার হাসপাতালের ভেতরের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ভয়ঙ্কর চিত্র সামনে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারীর দাবি—পুরো মনোহরদী উপজেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এখন এই কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীর নিয়ন্ত্রণাধীন নির্দিষ্ট এক সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
বাইরে চেম্বার নিষিদ্ধ, স্ত্রীর একচেটিয়া অস্ত্রোপচার
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রাশেদের অনুমতি ছাড়া হাসপাতালের কোনো চিকিৎসক বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বা চেম্বার করতে পারেন না। অন্যদিকে, হাসপাতালে আসা প্রসূতি রোগীদের সিজারিয়ান অপারেশনের ক্ষেত্রে বজায় রাখা হয়েছে একছত্র প্রভাব। অভিযোগ রয়েছে, ডা. রাশেদের স্ত্রী ‘নীলা’ ছাড়া অন্য কোনো সার্জন বা চিকিৎসককে সিজারিয়ান অপারেশন করতে দেওয়া হয় না। ফলে সরকারি সুবিধা থাকা সত্ত্বেও সাধারণ রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এনআরএস (NRS) ক্লিনিক ও স্বার্থের সংঘাত
সরকারি নিয়মে কোনো সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নিজস্ব প্রাইভেট ক্লিনিক পরিচালনা বা সরাসরি ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা আইনত দণ্ডনীয় হলেও মনোহরদীতে তা প্রকাশ্যে চলছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালের ঠিক কাছেই গড়ে উঠেছে ‘এনআরএস (NRS) প্রাইভেট হাসপাতাল’। তিনটি অক্ষরের এই নামকরণের নেপথ্যে রয়েছে—নীলা (N), রাশেদ (R) এবং তাদের অপর অংশীদার শিমুল (S)-এর নামের প্রথম অক্ষর। সরকারি হাসপাতালে আগত রোগীদের নানা অজুহাতে বা ল্যাব সুবিধা বন্ধ রেখে এই এনআরএস ক্লিনিকে পাঠাতে বাধ্য করার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
খাবারের ঠিকাদারি জিম্মি ও আউটসোর্সিং বাণিজ্য
ভর্তি থাকা সাধারণ রোগীদের যে সরকারি খাবার দেওয়া হয়, তার ঠিকাদারি নিয়েও চলছে জিম্মিকরণ। অভিযোগ রয়েছে, লাইসেন্সধারী মূল ঠিকাদারকে স্থানীয় ক্যাডার বাহিনী দিয়ে জিম্মি করে খাবারের সার্বিক সাপ্লাই ও বাজেট নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন এই দম্পতি। এছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে হাসপাতালে জনবল নিয়োগ এবং তাদের বেতন-ভাতা উত্তোলনের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ লোপাট করা হচ্ছে।
অন্ধকারে হাসপাতাল: ল্যাব অকেজো, ওষুধ গায়েব
দীঘদিন প্রধান কর্মকর্তা পদে বহাল থাকলেও হাসপাতালের সেবার মানোন্নয়নে ডা. রাশেদের ভূমিকা শূন্যের কোঠায়। সামান্য বিদ্যুৎ চলে গেলেই পুরো হাসপাতাল ভূতুড়ে পরিবেশে রূপ নেয়; জেনারেটর চালানো বা বিকল্প আলোর ব্যবস্থা করা হয় না। রক্ত পরীক্ষার মতো সাধারণ প্যাথলজিক্যাল সুবিধাও হাসপাতালে মিলছে না, যার সরাসরি সুবিধা পাচ্ছে তাদের নিজস্ব প্রাইভেট ক্লিনিক। এছাড়া সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ওষুধ সাধারণ রোগীরা পাচ্ছেন না বলেও ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
বদলি ঠেকাতে লাখ লাখ টাকার ঘুষের অভিযোগ
টানা বহাল থাকার পেছনের আসল রহস্য ফাঁস করেছেন হাসপাতালেরই এক কর্মচারী ও স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট মহলে বিভিন্ন সময়ে ১৫ থেকে ১৭ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিয়ে নিজেদের বদলি ঠেকিয়ে রেখেছেন এই দম্পতি। এমনকি পটপরিবর্তন ও নতুন সরকারের মেয়াদেও বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে নিজেদের পদ রক্ষা করা হয়েছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে।
সরকারি স্বাস্থ্যখাতের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং মনোহরদীবাসীকে এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্ত করতে এখন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি বিভাগীয় তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক সমাজ।